ইতালি যেতে কত টাকা লাগে 2026

ইউরোপের স্বপ্ন কার না থাকে? আর সেই স্বপ্ন যদি হয় শিল্প-সংস্কৃতি আর ইতিহাসের দেশ ইতালিকে ঘিরে, তবে তো কথাই নেই! আপনি যদি আজ এই লেখাটি পড়ছেন, তার মানে আপনার মনের কোণেও কোথাও না কোথাও ইতালির পিৎজা, কলোসিয়াম আর সুন্দর শহরগুলোর হাতছানি রয়েছে। কিন্তু স্বপ্নের পথে প্রথম বড় প্রশ্নটি কী? ঠিক ধরেছেন— “ইতালি যেতে কত টাকা লাগে?”

বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ কর্মসংস্থান বা পড়াশোনার জন্য ইতালিতে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সঠিক তথ্যের অভাবে অনেকেই দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারান। আজকের এই ব্লগে আমরা একদম পানির মতো পরিষ্কার করে জানবো, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আপনার ইতালি যাওয়ার আসল খরচ কত হতে পারে। চলুন, এক কাপ চা হাতে নিয়ে বসে পড়ুন, আপনার স্বপ্নের যাত্রার হিসাবটা আজ মিলিয়েই ফেলি!

ইতালি যেতে কত টাকা লাগে

ইতালি যাওয়ার খরচ মূলত নির্ভর করে আপনি কোন ভিসায় যাচ্ছেন তার ওপর। স্টুডেন্ট ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট ভিসা (সিজনাল বা নন-সিজনাল), নাকি ফ্যামিলি রিইউনিয়ন ভিসা—একেক ক্ষেত্রে খরচ একেক রকম। তবে মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হলো কাজের ভিসা বা স্পন্সর ভিসা।

অনেকেই ভাবেন দালালের হাতে ২০-২৫ লাখ টাকা দিলেই বুঝি কেল্লাফতে! কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সরকারি ফি এবং আনুষঙ্গিক খরচ এর চেয়ে অনেক কম। আপনি যদি সরাসরি কোনো কোম্পানির মাধ্যমে কাজ পান, তবে আপনার খরচ অনেক কমে আসবে।

ইতালির বিভিন্ন ভিসার ধরণ ও আনুমানিক খরচ

ইতালিতে যাওয়ার প্রধানত তিনটি জনপ্রিয় মাধ্যম রয়েছে। নিচে আমরা একটি টেবিলের মাধ্যমে এর প্রাথমিক খরচের ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছি। আপনি কি তৈরি আপনার স্বপ্নের ইতালির পথে পা বাড়াতে? আজই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গোছানো শুরু করুন!

ভিসার ধরণ আনুমানিক সরকারি ও প্রসেসিং খরচ (টাকায়) অন্যান্য খরচ (টিকিট ও হাত খরচ)
স্টুডেন্ট ভিসা ৫ লক্ষ থেকে ৮ লক্ষ টাকা। ২ লক্ষ থেকে ৩ লক্ষ টাকা।
স্পন্সর/ওয়ার্ক ভিসা ২০ লক্ষ থেকে ২৫ লক্ষ টাকা। ২ লক্ষ থেকে ৩ লক্ষ টাকা।
ফ্যামিলি ভিসা ২০ লক্ষ থেকে ২৫ লক্ষ টাকা। ২ লক্ষ থেকে ৩ লক্ষ টাকা।

স্টুডেন্ট ভিসায় ইতালি যাওয়ার খরচ

আপনি যদি একজন শিক্ষার্থী হন, তবে ইতালি আপনার জন্য স্বর্গ হতে পারে। ইতালির অনেক পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে টিউশন ফি নেই বললেই চলে, উল্টো স্কলারশিপ পাওয়া যায়।

  • ইউনিভার্সিটির আবেদন ও ভাষা শিক্ষা

প্রথমে আপনাকে আইইএলটিএস (IELTS) বা ইতালিয়ান ভাষার ওপর দক্ষতা অর্জন করতে হবে। এখানে কোচিং ফি বাবদ ৫ লক্ষ থেকে ৮ লক্ষ টাকা খরচ হতে পারে। ইউনিভার্সিটিতে আবেদনের সময় ছোটখাটো একটি ফি (Application Fee) দিতে হয় যা ৫০ হাজার টাকার মধ্যে।

  • ব্যাংক সলভেন্সি ও ব্লকড অ্যাকাউন্ট

ইতালি যাওয়ার জন্য আপনাকে দেখাতে হবে যে আপনার থাকার মতো পর্যাপ্ত টাকা আছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৫ লক্ষ টাকার একটি ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখাতে হয়। যদিও এটি খরচ নয়, শুধু দেখানো, তবুও এটি জোগাড় করতে অনেকের কিছু খরচ হতে পারে।

স্পন্সর বা কাজের ভিসায় ইতালি যেতে কত টাকা লাগে

বাংলাদেশিদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ইতালির ‘ফ্লুসি ডিক্রি’ বা স্পন্সর ভিসা। প্রতি বছর ইতালি সরকার নির্দিষ্ট সংখ্যক বিদেশি শ্রমিক নেওয়ার ঘোষণা দেয়।

  • নাল্লা ওস্তা (Nulla Osta) বা কাজের অনুমতি

ইতালি থেকে আপনার নিয়োগকর্তা যখন আপনার জন্য আবেদন করবেন, তখন একটি পেপার ইস্যু হয় যাকে বলা হয় ‘নাল্লা ওস্তা’। সরকারিভাবে এর খরচ খুব বেশি নয়, কিন্তু বাংলাদেশে সিন্ডিকেটের কারণে এটি পেতে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়ে যায়।

  • পাসপোর্ট ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স

আপনার যদি পাসপোর্ট না থাকে তবে ৬ হাজার থেকো ৮ হাজার টাকায় পাসপোর্ট করিয়ে নিতে হবে। এরপর লাগবে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, যার ফি মাত্র ২৫০০ টাকা। তবে ইদানীং সব অনলাইন হওয়ার কারণে কাজগুলো অনেক সহজ হয়ে গেছে।

ইতালির সিজনাল ও নন-সিজনাল ভিসার পার্থক্য ও খরচ

ইতালিতে কাজের ভিসা সাধারণত দুই ধরণের হয়। একটি হলো সিজনাল (Seasonal), যা সাধারণত ৯ মাসের জন্য হয়। অন্যটি নন-সিজনাল (Non-seasonal), যা দীর্ঘমেয়াদী কাজের জন্য।

  • সিজনাল ভিসার খরচ

কৃষিকাজ বা হোটেল সার্ভিসের জন্য এই ভিসা দেওয়া হয়। এই ভিসায় যাওয়ার খরচ তুলনামূলক কম থাকে, কারণ মেয়াদের একটা সীমাবদ্ধতা আছে। তবে একবার সিজনাল ভিসায় গিয়ে ভালো রেকর্ড থাকলে পরবর্তী বছরে কাজ পাওয়া আরও সহজ হয়।

  • নন-সিজনাল ভিসার সুবিধা

নন-সিজনাল ভিসায় খরচ একটু বেশি হলেও এতে স্থায়িত্ব বেশি। আপনি যদি দক্ষ শ্রমিক হিসেবে (যেমন: ড্রাইভার, ইলেকট্রিশিয়ান বা কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কার) যান, তবে বেতনও অনেক ভালো পাবেন। এক্ষেত্রে খরচ ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ছাড়িয়ে যেতে পারে যদি আপনি এজেন্সির মাধ্যমে যান।

ভিসা প্রসেসিং ও অ্যাম্বাসি ফি

ভিসার আবেদনের জন্য আপনাকে ভিএফএস গ্লোবাল (VFS Global) বা ইতালিয়ান অ্যাম্বাসিতে ফি জমা দিতে হবে।

  • অ্যাম্বাসি ফি এবং ইনস্যুরেন্স

ভিসা ক্যাটাগরি ভেদে অ্যাম্বাসি ফি সাধারণত ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। এর সাথে আপনাকে একটি ট্রাভেল ইনস্যুরেন্স করতে হবে, যার খরচ পড়বে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা।

  • মেডিকেল টেস্ট ও অন্যান্য

বিদেশে যাওয়ার আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা মেডিকেল টেস্ট বাধ্যতামূলক। সরকারি অনুমোদিত সেন্টার থেকে মেডিকেল করতে আপনার ৫,০০০ থেকে ৭,০০০ টাকা খরচ হতে পারে। এছাড়া প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নোটারি বা সত্যায়িত করতে আরও কিছু টাকা হাতে রাখতে হবে।

বিমান ভাড়া ও প্রাথমিক হাত খরচ

ভিসা তো হাতে পেলেন, এবার তো উড়াল দেওয়ার পালা! কিন্তু বিমানের টিকিট কাটতেও তো মোটা অংকের টাকা লাগে।

  • বিমান টিকিটের দাম

ঢাকা টু রোম বা মিলান ফ্লাইটের টিকিট নির্ভর করে আপনি কতদিন আগে কাটছেন তার ওপর। ওয়ান ওয়ে টিকিট সাধারণত ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা থেকে ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। সিজনভেদে এই দাম কম-বেশি হতে পারে।

  • বিদেশে নামার পর হাত খরচ

ইতালিতে পৌঁছেই আপনি কাজ পেয়ে যাবেন না। প্রথম এক-দুই মাস থাকা-খাওয়ার জন্য আপনার পকেটে অন্তত ১,০০০ থেকে ১,৫০০ ইউরো (প্রায় ১.৫ থেকে ২ লাখ টাকা) রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ বিদেশের মাটিতে কারো কাছে হাত পাতা যেমন কষ্টের, তেমনি সম্মানেরও হানি ঘটে।

দালালের খপ্পর থেকে বাঁচার উপায়

আমরা প্রায়ই শুনি, ২০ লাখ টাকা দিয়ে ইতালি গিয়ে এখন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি।” এর কারণ হলো সঠিক তথ্যের অভাব। দালালরা অনেক সময় ভুয়া নাল্লা ওস্তা বা জাল ভিসা দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়।

কীভাবে বুঝবেন কোনটি আসল ভিসা?

  • সবসময় চেষ্টা করবেন সরাসরি মালিকের সাথে যোগাযোগ করতে।
  • নাল্লা ওস্তা পাওয়ার পর সেটি ইতালিয়ান সরকারি পোর্টালে চেক করে নিন।
  • কোনো দফারফা করার আগে পরিচিত কেউ ইতালিতে থাকলে তার সাহায্য নিন।
  • টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে সবসময় লিখিত ডকুমেন্ট বা ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করার চেষ্টা করুন।

ইতালিতে গেলে কত টাকা আয় করা সম্ভব?

এত টাকা খরচ করে ইতালি যাচ্ছেন, কিন্তু আয় কত হবে তা না জানলে হিসাব মিলবে না। ইতালিতে একজন সাধারণ শ্রমিকের মাসিক বেতন সাধারণত ৮০০ ইউরো থেকে ১,২০০ ইউরোর মধ্যে হয়। বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় ১ লক্ষ থেকে ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। আপনি যদি দক্ষ কাজ জানেন, তবে আয় ২ লক্ষ টাকাও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

তবে মনে রাখবেন, আয়ের পাশাপাশি সেখানে থাকার খরচও কিন্তু বেশ ভালো। থাকা-খাওয়া বাবদ মাসে অন্তত ৪০০-৫০০ ইউরো খরচ হবেই। সব বাদ দিয়ে আপনি মাসে ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকা অনায়াসেই দেশে পাঠাতে পারবেন।

আরও পড়ুনঃ ইতালি ভিসা আবেদন ফরম

প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা

ইতালি যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হলে আপনার নিচের কাগজপত্রগুলো আগে থেকেই গুছিয়ে রাখা উচিত:

  • নূন্যতম ৬ মাস মেয়াদী বৈধ পাসপোর্ট।
  • সদ্য তোলা ল্যাব প্রিন্ট ছবি (সাদা ব্যাকগ্রাউন্ড)।
  • সকল শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ।
  • পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট।
  • কাজের অভিজ্ঞতার সনদ (যদি থাকে)।
  • ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সলভেন্সি সার্টিফিকেট।

সর্বশেষ তথ্যঃ

ইতালি যাওয়া মানে শুধু একটি দেশ পরিবর্তন নয়, বরং নিজের এবং পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তনের একটি সুযোগ। তবে এই সুযোগ যেন আপনার গলার কাঁটা না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। “ইতালি যেতে কত টাকা লাগে” এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা দেখলাম যে, আপনি যদি সঠিক পথে এবং সরাসরি ভিসার আবেদন করেন, তবে খরচ আপনার নাগালের মধ্যেই থাকে।

অতিরিক্ত লোভে পড়ে বা দালালের চটকদার কথায় বিভ্রান্ত হয়ে জীবনের সব সঞ্চয় বা ভিটেমাটি বিক্রি করে অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়াবেন না। মনে রাখবেন, ধৈর্য এবং সঠিক তথ্যই আপনাকে সফলভাবে ইতালির মাটিতে পৌঁছে দিতে পারে।

আপনার যদি ইতালি যাওয়া সংক্রান্ত আরও কোনো প্রশ্ন থাকে বা আপনার কোনো অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চান, তবে নিচে কমেন্ট বক্সে আমাদের জানাতে পারেন। আমরা চেষ্টা করবো আপনাকে সঠিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করতে। আপনার ইউরোপ যাত্রা শুভ হোক!

Leave a Comment